অপটিক্যাল ফাইবার কি - স্যাটেলাইট ও অপটিক্যাল ফাইবার এর পার্থক্য

অপটিক্যাল ফাইবার কি? কত প্রকার ও ক্যাবল পরিচিতি

অপটিক্যাল ফাইবার প্রযুক্তির একটি সমৃদ্ধ মাইলফলক। দ্রুতগতির সাথে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য অপটিক্যাল ফাইবারের গুরুত্ব অপরসীম। কিন্তু অপটিক্যাল ফাইবার কি, কী কাজে ব্যবহার করা হয়, এটি কত প্রকার এবং এর সুবিধা অসুবিধা সম্পর্কে অনেকেই জানে না। তাদের জন্যই এই আর্টিকেলটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রযুক্তি আসার আগে সহজ ও একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে কাগজের চিঠির প্রচলন ছিল। সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত এবং সবার জন্যই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তখন প্রিয়জনদের কাছে চিঠির মাধ্যমে কোন তথ্য আদান-প্রদান করতে বেশ সময় লেগে যেতো। তাছাড়া, এটি ছিল অনেকটা অনিরাপদ একটি ব্যবস্থাপনা।

তাই মানুষ একটি নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা আবিস্কার করার জন্য গবেষণা করতে লাগল। অবশেষে সফলও হয়। প্রাচীন যোগাযোগ ব্যবস্থার ধারণা পাল্টে দিল প্রযুক্তির এক কালজয়ী আবিস্কার টেলিফোন, এর পর এলো মোবাইল ফোন

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে মোবাইল ফোনের ব্যবহার আজ অবদি গুরুত্বের সাথে চলছে। কিন্তু মোবাইল আবিস্কার করেই মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়নি। গবেষণা অব্যহত রেখে তৈরি করে নিল অপটিক্যাল ফাইবার (Optical fiber)।

চলুন জেনে নিই অপটিক্যাল ফাইবার কাকে বলে এবং এর আদ্যোপান্ত।

অপটিক্যাল ফাইবার কি?

অপটিক্যাল ফাইবার এক ধরণের পাতলা এবং স্বচ্ছ তার (wire), যা বিশুদ্ধ কাচ (Glass) অথবা প্লাস্টিক দিয়ে বানানো হয়।

এই তারটি সাধারণত চুলের চেয়েও অনেক চিকন। তবে Data আদান-প্রদানে এটি অত্যন্ত দ্রুতগতির সাথে কাজ করে।

এক কথায় বলা যায়, ফাইবার অপটিক্স এমন এক আধুনিক প্রযুক্তি যা দীর্ঘ দূরত্বে গ্লাস বা প্লাস্টিকের তৈরি ফাইবারের তারের মাধ্যমে আলোর স্পন্দন হিসাবে তথ্য প্রেরণ করতে ব্যবহৃত হয়।

একটি ফাইবার অপটিক কেবলে গ্লাস ফাইবারগুলোর বিভিন্ন সংখ্যা থাকতে পারে। যেমন এক থেকে একশত পর্যন্ত। এখানে কাচের বিভিন্ন স্তর থাকে, যাকে ক্ল্যাডিং বলা হয় এবং গ্লাস ফাইবার কোরকে ঘিরে থাকে।

বাফার টিউব স্তরটি ক্ল্যাডিংকে রক্ষা করে এবং একটি জ্যাকেট স্তর পৃথক স্ট্র্যান্ডের জন্য চূড়ান্ত প্রতিরক্ষামূলক স্তর হিসাবে কাজ করে।

ফাইবার অপটিক এর তারগুলো সাধারণত কাচ বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়। কারণ তামার তারের তুলনায় এতে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। সুবিধাগুলির মধ্যে রয়েছে উচ্চ মানের ব্যান্ডউইথ এবং ট্রান্সমিট গতি।

ফাইবার অপটিক্স দীর্ঘ-দূরত্ব এবং উচ্চ-কর্মক্ষমতা ডেটা নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি সাধারণত টেলিযোগাযোগ পরিষেবাগুলোতে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন ইন্টারনেট, টেলিভিশন এবং টেলিফোন ইত্যাদি।

উদাহরণস্বরূপ, Verizon এবং Google তাদের Verizon FIOS এবং Google Fiber পরিষেবাগুলিতে যথাক্রমে ফাইবার অপটিক্স ব্যবহার করে, এবং ব্যবহারকারীদের জন্য গিগাবিট ইন্টারনেট গতি প্রদান করে।

অপটিক্যাল ফাইবার কিভাবে কাজ করে?

ফাইবার অপটিক্স আলোর কণার আকারে ডেটা প্রেরণ করে। অর্থাৎ, অপটিক্যাল ফাইবার একধরনের ক্যাবল যার ভেতর কাচের সরু দণ্ড থাকে, একপাশ থেকে আলো ফেললে অপর পাশে দ্রুততার সাথে পৌঁছে যায়।

আমরা জানি, আলো সরল পথে চলে। তাই করিডোরের একপাশ থেকে অপরপাশে আলো দিয়ে কাউকে সংকেত দিলে করিডোর যদি সম্পূর্ণ সোজা হয় তাহলে সহজেই আলোর সিগন্যাল ওপাশে চলে যাবে।

কিন্তু করিডোর যদি বাঁকা হয় তবে বাঁকা স্থানে একটি আয়না বসিয়ে দিলে আলো প্রতিসারঙ্ক (The refractive index of light) হয়ে অপরপাশে সিগন্যাল পৌঁছানো যাবে।

Optical fiber এর তারের মাধ্যমে আলো মূলত এভাবেই বাউন্স হতে হতে একপাশ থেকে অপরপাশে পৌঁছে যায়।

তবে তারের ভেতর আলোর ভ্রমণের গতি সমান্তরাল নয়। অনেক সময় অপটিক্যাল ফাইবারের তারে ঘন কাচের স্তর থাকার কারণে আলোর সংকেতগুলো আলোর গতিতে ভ্রমণ করে না, বরং আলোর গতির চেয়ে প্রায় 30% ধীর গতিতে ভ্রমণ করে।

আলোর যাত্রাকে বুস্ট করার জন্য ফাইবার অপটিক্স ট্রান্সমিশনে কখনও কখনও রিপিটার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। এই রিপিটারগুলো অপটিক্যাল সিগন্যালকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে, এবং সেই বৈদ্যুতিক সংকেতটিকে বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াকরণ করে অপটিক্যাল সংকেতকে পুনরায় প্রেরণ করে।

ফাইবার অপটিক কেবলগুলো বর্তমানে 10 Gbps পর্যন্ত ডেটা একসাথে আদান -প্রদান করতে সক্ষম। তবে সাধারণত একটি ফাইবার অপটিক তারের ব্যান্ডউইথ ক্ষমতা যত বাড়ে, তত বেশি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

অপটিক্যাল ফাইবার কত প্রকার?

অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল
অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল

কাজের উপর ভিত্তি করে ITU (International Telecommunication Union) সাধারণত Optical fiber এর তিনটি মান প্রকাশ করে।

  • সিঙ্গেল মোড স্টেপ ইনডেক্স
  • মাল্টিমোড স্টেপ ইনডেক্স
  • মাল্টিমোড গ্রেডেড ইনডেক্স

‘মোড’ শব্দটিকে সেই পদ্ধতি হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে যার মাধ্যমে আলো ফাইবারের মধ্যে প্রচারিত হয়। অর্থাৎ, ফাইবারের তারে আলো ভ্রমণ করার জন্য বিভিন্ন পথ গ্রহণ করতে পারে।

প্রত্যেক ফাইবার অপটিক সুরক্ষার জন্য তারের উপর একটি শক্ত প্লাস্টিকের জ্যাকেট দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে।

অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলকে নেটওয়ার্কের ব্যাকবোন বলা হয়।

সিঙ্গেল মোড – Single mode Optical fiber

Single mode step index  (এসএম) ফাইবার, যার শুধুমাত্র একটি তার বা পথ রয়েছে।

সিঙ্গেল মোড ফাইবারে প্রায় 5 μm ব্যাসের একটি খুব পাতলা কোর থাকে এবং এটি তুলনামূলকভাবে বড় ক্ল্যাডিং, গ্লাস বা প্লাস্টিকের হয়।

এটির মাধ্যমে অল্প ডেটা বা হালকা সংকেত পাঠাতে ব্যবহার করা হয়। এটি টিভি চ্যানেল বা 14000 ফোন কলের চেয়ে বেশি বহন করতে পারে।

মাল্টিমোড – Multi mode step index

এই ধরণের ফাইবারের একটি কোর থাকে অপেক্ষাকৃত বড় ব্যাস যেমন 50 μm। এটি বেশিরভাগই সাদা আলো বহন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আলো বিচ্ছুরণের প্রভাবের কারণে, এটি শুধুমাত্র অল্প দূরত্বের জন্য উপযোগী।

ফাইবার কোরের একটি ধ্রুবক প্রতিসরাঙ্ক সূচক থাকে, যেমন 1.52 হিসাবে, এর কেন্দ্র থেকে ক্ল্যাডিং সহ সীমানা পর্যন্ত। প্রতিসরাঙ্ক সূচকটি তারপর একটি নিম্ন মান n2 এ পরিবর্তিত হয়, যেমন 1.48, যা পুরো ক্ল্যাডিং জুড়ে স্থির থাকে।

একে স্টেপ ইনডেক্স মাল্টিমোড ফাইবার বলা হয়, কারণ প্রতিসরণ সূচকটি ক্ল্যাডিংয়ের সীমানায় 1.52 থেকে 1.48 পর্যন্ত নেমে আসে।

মাল্টিমোড – Multi mode graded index

মাল্টি মোড গ্রেডেড ইনডেক্স ফাইবারের কোর রয়েছে যার ব্যাস 50 থেকে 1000 μm পর্যন্ত। এটির একটি কোর তুলনামূলকভাবে উচ্চ প্রতিসরণ সূচক রয়েছে এবং প্রতিসরাঙ্ক সূচকটি ফাইবারের বাইরের পৃষ্ঠের মাঝখান থেকে ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।

কোর এবং ক্ল্যাডিংয়ের মধ্যে কোনও লক্ষণীয় সীমানা নেই৷ এই ধরণের ফাইবারকে মাল্টি মোড গ্রেডেড ইনডেক্স ফাইবার বলা হয় এবং এটি দীর্ঘ দূরত্বের অ্যাপ্লিকেশনগুলির জন্য দরকারী যেখানে সাদা আলো ব্যবহার করা হয়।

এই ধরণের ফাইবারের মাধ্যমে আলোর সংক্রমণের মোডও একই, অর্থাৎ, মসৃণভাবে হ্রাস হওয়া প্রতিসরণ সূচকের পৃষ্ঠ থেকে ক্রমাগত প্রতিসরণ এবং বাইরের পৃষ্ঠের সীমানা থেকে মোট অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন।

অপটিক্যাল ফাইবার এর কাজ কি?

অপটিক্যাল ফাইবার কি কাজে ব্যবহার করা হয় বা অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহারের ক্ষেত্র কোনটি এই বিষয়ে আমাদের জেনে নেওয়া দরকার।

অপটিক্যাল ফাইবার এর ব্যবহার সমূহঃ

() ওয়াইফাই এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে।

(২) ডিশ ব্যবহারে।

(৩) মেডিক্যাল গ্যাজেট বা চিকিৎসা ক্ষেত্রে ।

(৪) মিলিটারি কমিউনিকেশনে।

(৫) ডেটা শেয়ারিং ইত্যাদি।

  • অপটিক্যাল ফাইবার ইন্টারনেট কিমিউনিকেশন এর জন্য অনেক বেশী ব্যবহার করা হয়।
  • দূরবর্তী ডিশ কানেকশনে Optical fiber cable এর ব্যবহার করে থাকে। এতে High quality video পাওয়া যায়।
  • ডেটা শেয়ারিং কানেকশনে ফাইবার ক্যাবল ব্যবহার হয়। এতে ট্রান্সমিট ‍স্পিড অনেক বেশি থাকে।
  • মেডিক্যাল গ্যজেট বা চিকিৎসা ক্ষেত্রে অপটিক্যাল ফাইবারের ব্যবহার হয়।
  • মিলিটারিদের কমিউনিকেশন এবং গোপনীয় সার্ভার কন্ট্রোল করার জন্য Optical fiber cable খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অপটিক্যাল ফাইবার এর মাধ্যমে অনেক বেশী সমৃদ্ধশালী হয়েছে।

স্যাটেলাইট ও অপটিক্যাল ফাইবার এর পার্থক্য

ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে অপটিক্যাল ফাইবার ও স্যাটেলাইটের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এটি আপনাকে জানা প্রয়োজন।

স্যাটেলাইট এবং অপটিক্যাল ফাইবার এর সুবিধা ও অসুবিধা গুলো নিচে তুলে ধরা হলোঃ

() বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে স্যাটেলাইট থেকে সিগন্যাল পেতে বেশ ভোগান্তি হয়ে থাকে। কিন্তু অপটিক্যাল ফাইবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর মধ্যেও সিগন্যাল পাঠাতে সক্ষম।

(২) স্যাটেলাইট তারবিহীন যোগাযোগের একটি মাধ্যম। অন্যদিকে অপটিক্যাল ফাইবার তারযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা।

(৩) অপটিক্যাল ফাইবার সরাসরি তারযুক্ত কানেকশনের কারণে এর গতি স্যাটেলাইট অপেক্ষা অনেক বেশী।

(৪) স্যাটেলাইট এর মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গকে বেঁচে নেওয়া হয়। কিন্তু অপটিক্যাল ফাইবারে তথ্য আদান -প্রদানের জন্য সংকেত কিংবা আলো ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

(৫) স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অর্থাৎ মহাশূন্যে অবস্থান করে। কিন্তু অপটিক্যাল ফাইবার সমুদ্র পৃষ্ঠে অবস্থান করে।

এগুলোই হলো স্যাটেলাইট ও অপটিক্যাল ফাইবার এর সাধারণ পার্থক্য। অনেকেই জানতে চান স্যাটেলাইট ও অপটিক্যাল ফাইবার এর মধ্যে কোনটি বেশি কার্যকর?

ক্ষেত্র বিশেষে একটি অপরটি থেকে অনেক বেশী কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। যদিওবা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে স্যাটেলাইট অপেক্ষা অপটিক্যাল ফাইবার দ্রুত গতিতে ডেটা আদান প্রদান করে।

তবে এখানেই শেষ নয়। এর কিছু ফিচার এবং এডভান্টেজে আরো বিষয় রয়েছে। যা পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

তবে এতটুকু জেনে নিন যে প্রযুক্তির এই কালজয়ী দুই আবিস্কারকে একে অপরের পরিপূরক বলা যায়।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথাঃ

প্রিয় পাঠক, আমি চেষ্টা করেছি অপটিক্যাল ফাইবার কি, এটি কত প্রকার এবং স্যাটেলাইট ও অপটিক্যাল ফাইবার এর পার্থক্য আপনাদের সামনে সহজ ভাবে তুলে ধরার জন্যে।

আপনি যদি পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ে থাকেন তবে আশাকরি “অপটিক্যাল ফাইবার কাকে বলে” এর উপর আপনি পূর্ণাঙ্গ ধারণা করতে পারেন।

এই বিষয়ে যদি আপনার কোন প্রশ্ন বা মতামত থাকে তবে কমেন্ট করে আমাদের জানাতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ

NAZIRUL ISLAM NAKIB

যত জ্ঞান-ধন করেছি অর্জন জীবনের প্রয়োজনে,
তার সবটুকুই বিলাতে চাই সৃষ্টির কল্যাণে।

Add comment

error: Content is protected !!