jeff bezos

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী জেফ বেজোসের জীবনী

জেফ বেজোসের জীবনী: পৃথিবীতে এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তার কাঙ্খিত বিষয়ে সফল হতে চায় না। কিন্তু সফলতা কি সবার কাছে ধরা দেয়? কখনই না। তবে একথা সত্য যে, যারা সময়ের মূল্য বুঝে এবং পরিকল্পনা মতো কাজ করে তাদের কাছে সফলতা খুব সহজেই ধরা দেয়।

কিন্তু সব মানুষের সফলতার লক্ষ্য কখনই এক নয়। কেউ অর্থ দিয়ে সফল হতে চায়, কেউ শিক্ষা দিয়ে সফল হতে চায়, কেউ সন্তান সন্তুতি দিয়ে সফল হতে চায়, আবার কেউ জায়গা জমি দিয়ে সফল হতে চায়। এভাবে প্রতিটি মানুষের সফলতার লক্ষ্য বৈচিত্রময় থাকে। আজ আমরা এমনই একজন সফল মানুষের সাফল্যের গল্প শুনবো, যিনি অর্থ দিয়ে সফলতা অর্জন করেছেন। সেই মানুষটির নাম জেফ বেজোস। 

জেফ বেজোসের জীবনী

জেফ বেজোস একজন মার্কিন ইন্টারনেট উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারী। তিনি ৯৬৪ সালের ২ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। 

বর্তমানে তিনি বিশ্বের শীর্ষ ধনী হলেও তার জন্ম ছিল সাধারণে পরিবারে। জন্মের সময় তার মা ছিল৭ বছরের একজন কলেজ ছাত্রী। তার জন্মের৭ মাস পরেই তার মা-বাবার মাঝে বিবাহ সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে তার মা একসন নামক কোম্পানির এক ইঞ্জিনিয়ারকে বিবাহ করেন। এবং তিনি সেই সৎ বাবার কাছেই বড় হন।

জেফ বেজোসের প্রতিভা ও শিক্ষা

ছোটবেলা থেকেই ভিন্ন কিছু করতে জেফ বেজোস ছিলেন অত্যন্ত উৎসুক। যখন তিনি হাটতেও পারেন না, তখন স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে তার দোলনার পার্স খুলে ফেলেন। তার সৎ ভাই যেনো তার রুমে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য তিনি বৈদ্যুতিক দরজার ঘন্টা তৈরি করে ফেলেন।

চতুর্থ ক্লাসে থাকা অবস্থায় তার স্কুলে কম্পিউটার আনা হয়। তখন ক্লাসের শিক্ষকরাও তেমন কম্পিউটার পরিচালনা করতে জানতো না। অথচ, তখন বেজস কম্পিউটার চালিয়ে সবাইকেই অবাক করে দেন। এই প্রতিভাগেুলোর জন্য ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি সিলবার পুরুস্কার ও জাতীয় স্কলারশিপ প্রদান করেন।

জেফ বেজোসের কর্ম জীবনের শুরু

কলেজে অধ্যায়নকালে দীর্ঘদিন তিনি ম্যাকডোনাল্ডসে বার্গার তৈরির কাজ করেছেন। ২০০ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জীবনে কোনো কাজের অভিজ্ঞাই বৃথা যায় না। ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করতে গিয়ে আমি শিখেছিলাম কিভাবে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। পাশাপাশি উন্নত গ্রাহক সেবার পদ্ধতি ও ছাপের মুখে কাজ করার দক্ষতা।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পূর্ণ করার পর তিনি টি-শো নামক এক কোম্পানির অর্থনীতি বিভাগে নিযুক্ত হন। তার উদ্ভাবনি কার্যক্রমের জন্য তিনি অল্পদিনেই কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়ে যান।

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী জেফ বেজোসের জীবনী

অ্যামাজন শুরুর ইতিহাস

তখন ৯৯০ সালের দিকে নতুন নতুন ইন্টারনেটের উদ্ভাবন হয়। শুধুমাত্র সরকারি বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান সহ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গুলোতেই কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহৃত হতো। বেজস তার কোম্পানি হতে জানতে পারেন, প্রতি বছর প্রায় ২৩০০% শতাংশ হারে ইন্টারনেটের ব্যবহারকারী বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারছিলেন ইন্টারনেট বড় ধরণের একটি পরিবর্তন ঘটাতে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নতুন কিছু করার এখনই সঠিক সময়। তাই তার স্বপ্নটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আকর্ষনীয় চাকরিটি ছেড়ে দেওয়ার সিন্ধান্ত নেন।

তিনি যে কারণে চাকরি ছাড়তে চেয়েছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও ঝূকিপূর্ণ। তাই তার মা বেজোসকে চাকরি ছাড়তে বারণ করেছিলেন। তখন বেজোস তার মাকে বলেন, জীবনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি এবং এটা ভবিষ্যতেও করতে পারবো। এই নিয়ে চিন্তা নেই।

তবে আজ যদি নিজের স্বপ্নটাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা না করি, তাহলে সারাজীবন আফসোস থেকে যাবে। তিনি বিনিয়োগের জন্য তার বাবা মার কাছে আর্থিক সহযোগিতা চান। তার সৎ বাবা বিষয়টি শুনে বেজসকে প্রশ্ন করেন, ইন্টারনেট! এটা আবার কি জিনিস!? ভেজসের মা উত্তরে বলেন, আমরা ইন্টারনেটে বিনিয়োগ করছি না। বেজসের প্রতিভায় বিনিয়োগ করছি।

তারপর তার বাবা মা তাদের সঞ্চয়কৃত ৩ লক্ষ ডলার আমাজনের ৬ শতাংশ মালিকানার বিনিময়ে বেজোসকে দিয়ে দেন। একটি সাক্ষাৎকারে বেজস বলেছিলেন, তখন আমি ৭০ শতাংশ নিশ্চিত ছিলাম যে, আমি ব্যর্থ হবো। ৯৯৪ সালে বেজস তার বাড়ির গ্যারেজে ৩ টি কম্পিউটার ও ৩ জন সহযোগি নিয়ে আমাজনের যাত্রা শুরু করেন।

এভাবেই তিনি ইন্টারনেটের মাধ্যমে সর্বপ্রথম পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের পদ্ধতি চালু করেন। প্রথমে প্রায় ২০ ধরণের পণ্যের তালিকা তৈরি করেছিলেন। তার মধ্য হতে শুধু বই নিয়েই আমাজনের যাত্রা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী জেফ বেজোসের জীবনী

তিনি আমাজন নদীর নামেই তার প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন। কারণ, আমাজন হলো পৃতিবীর সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় নদী। তিনি তার প্রতিষ্ঠানকেও তেমনী বিশাল আকারে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। বাস্তবেই তা ঘটে গেলো।

শুরুরদিকে পণ্য গ্রাহকদের তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে৯৯৫ সাল থেকে আমাজন নতুন রূপ ধারণ করে। বাড়তে থাকে গ্রাহক। উক্ত বছরের প্রথম মাসেই আমেরিকার ৫০ টি প্রদেশ ও অন্যান্য ৪৫ টি দেশে বই বিক্রি করতে সক্ষম হন। তারপর থেকে প্রতি সাপ্তাহে প্রায় ২০ হাজার ডলার সমমূল্যের বই বিক্রি হতে থাকে। এভাবেই আস্তে আস্তে বিস্তার হয় ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে যান।

প্রথমদিকে আমাজনের ওয়েবসাইট থেকে বই অর্ডার করা গেলেও সরাসরি কেনার কোনো পদ্ধতি ছিল না। গ্রাহকেরা বই পছন্দ করে ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করত। তারপর বেজোস ও তার সহকর্মীদের নিয়ে প্যাকেট করে বই গ্রাহকদের ঠিকানায় পৌঁছে দিতো।

পরবর্তীতে বেজোস ও তার সহকর্মীরা মিলে আমাজনের ওয়েবসাইটে সরাসরি কেনাকাটার প্রযুক্তি যুক্ত করে। যেই প্রযুক্তি বর্তমানে বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন অ্যাপসে দেখা যায়। এই প্রযুক্তি সর্বপ্রথম আমাজনেই উদ্ভাবন করেছিল। যা আজ বিশ্বজুড়ে কোটি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে।

একজন সৃজনশীল ব্যক্তি হিসেবে জেফ বেজোস সর্বদায় নতুন নতুন সৃজনের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আমাজন ’মাল্টি ভেন্ডর’ নামে এমন প্রযুক্তি যোগ করেন, যা ই-কমার্স বাণিজ্যকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়।

প্রথম দিকে তিনি একা পণ্য বিক্রি করলেও পরবর্তীতে অন্যান্য কোম্পানিকেও আমাজনে পণ্য কেনা-বেচার সুযোগ করে দেন। যার ফলে যে কোনো প্রতিষ্ঠান আমাজনে বাণিজ্যিক একাউন্ট খুলে তাদের পণ্যগুলো লিস্টিং করার মাধ্যমে অনলাইনে বিক্রি করতে পারে। এতে প্রায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আমাজনে তাদের পণ্যগুলো লিস্টিং করতে শুরু করে। ফলে বইয়ের পাশাপাশি সকল ধরণের পণ্য চলে আসে। এভাবেই বিশ্বজুড়ে ক্রেতা-বিক্রেতার কাছে বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে আমাজন।

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী জেফ বেজোসের জীবনী

জেফ বেজোসের সফলতা

২০০০ সালের দিকে আমাজন বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বেজোস তো বিলিনিয়ার হয়েছেনই, সাথে তার মা-বাবাও প্রতিষ্ঠানটির ৬ শতাংশ মালিকানা পেয়ে বিলিনিয়ার হয়ে যান।

পরবর্তীতে আমাজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিনে নেওয়ার মাধ্যমে আরো বিশাল আকার ধারণ করে। ঠিক আমাজন নদীর মতো! আমেরিকার জনপ্রিয় পত্রিকা The Washington Post সহ prime video, amazon web services, BLUE ORIGIN ইত্যাদি সহ বর্তমানে আরো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক হলেন জেফ বেজোস।

বিল গেটসকে ছাড়িয়ে ৫০+ বিলিয়ন ডলারের মাধ্যমে জেফ বেজোস পৃথিবীর শীর্ষ ধনীর খেতাব অর্জন করেন। বর্তমানে (২০২ সালে) তার ৯২.৩ বিলিয়ন+ ডলারের মালিকানা রয়েছে। তার এই অর্থের সফলতা বিশ্বব্যাাপী মানুষকে উৎসাহিত করেছে। এখনো করছে। ভবিষ্যিতেও করবে বলে মনে করি।

শেষ কথাঃ

সফলতা এমন একটি বিষয়, যা সবার কাছে ধরা দিতে চায় না। তবে যারা কঠোর পরিশ্রমী এবং সঠিক ভাবে পরিকল্পনা করে সময়কে মূল্য দেয় তাদের সফলতা আসবেই। আজ নাহয় কাল। এজন্য প্রথমে আপনার লক্ষ্য নির্ধারণ করতেই হবে। লক্ষ্য নির্ধারণের পর নিয়ত। নিয়তের উপর সকল কর্মের ফলাফল আসে। 

তাই যে কোন কাজের সফলতার জন্য পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে। সময়ের মূল্য দিতে হবে। নতুন নতুন বিষয়ের উপর রিসার্চ করতে হবে। কাঙ্খিত সফলতা অর্জনে আপনার লক্ষ্যকে এনালাইসিস করতে হবে। এনালাইসিস করে যদি ভালো আউটপুট পান তবেই সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। প্রকৃতপক্ষে একজন  উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য এই গুণগুলো অত্যন্ত জরুরি।

ItNirman English

Add comment