ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল নাকি হারাম

ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল নাকি হারাম?

প্রিয় পাঠক, প্রযুক্তির এই যুগে আমরা প্রায় সকলেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকি। বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই ইন্টারনেট ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ইন্টারনেটকে আলাদা একটি জগত বলা যায়। এই জগতেও মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চুক্তি ও লেনদেন হয়। অনলাইন থেকে যে চুক্তির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা হয় তাকে ইন্টারনেটের ভাষায় ফ্রিল্যান্সিং বলা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল?

ইতোমধ্যেই একটি বিষয় সকলেই লক্ষ্য করে থাকবেন যে, ইন্টারনেট ভিত্তিক বাণিজ্য ক্রমান্বয়েই জনপ্রিয় হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো সহজলভ্যতা ও সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু আমরা যারা মুসলমান আছি, তাদের জন্য অবশ্যই স্রষ্টা প্রদত্ত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও বিধি-বিধান রয়েছে। তাই অর্থ উপার্জনের বিষয়েও বেশ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।

ফ্রিল্যান্সিং সাধারণত অনলাইন থেকে উপার্জনকেই বুঝানো হয়। তাই অনেকে আবার এভাবে জানতে চায় অনলাইন উপার্জন কি হালাল? যাইহোক,

ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল নাকি হারাম তা জানার আগে আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে “ফ্রিল্যান্সিং এর বেসিক কনসেপ্ট সম্পর্কে”। তাহলে আপনি নিজেই কিছুটা হলেও বাছ-বিচার করতে পারবেন। তাছাড়া, কুরআন হাদিসের আলোকেও এই বিষয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি।

ফ্রিল্যান্সিং কি?

ফ্রিল্যান্সিং হলো মুক্ত পেশা। অর্থাৎ, যে পেশায় কাজ করতে কারো কোন হস্তক্ষেপ বা বাঁধা নেই। সমাজ জীবনে আমরা যেভাবে একে অপরের সাথে চুক্তিবদ্ধ হই এবং পরস্পরের মাঝে কাজের পারিশ্রমিক আদান-প্রদান করি, ঠিক একই ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারে যে কাজ করা হয় এবং সে কাজের পারিশ্রমিক স্বরূপ যে অর্থ উপার্জন হয় তাকেই ফ্রিল্যান্সিং বলে।

পড়ার সাজেশনঃ
কিভাবে ব্লগিং শুরু করবো?
গ্রাফিক্স ডিজাইন কি এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন কত প্রকার?

জীবিকা নির্বাহ বা অর্থ উপার্জনের জন্য আমরা সাধারণত দোকান বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা করে থাকি। আবার নিজ উদ্যোগে বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে শিক্ষক হিসেবে আমরা নতুনদেরকে প্রশিক্ষণ দিই। তাছাড়া, আমরা অনেকেই দিনমজুরের কাজ করি। সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং বাস্তবতায় এগুলোকেই আমরা ব্যবসা এবং চাকরি বলে থাকি।

এই কাজ গুলোই যদি আপনি ইন্টারনেট ব্যবহার করে করেন, তাহলেই এটা ইন্টারনেটের ভাষায় ফ্রিল্যান্সিং হয়ে যায়। সূতরাং বুঝতেই পারছেন ফ্রিল্যান্সিং কি।

ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল?

হালাল এবং হারামের বিষয় প্রত্যেক জায়গায় বিদ্যমান। একথা কারোই অজানা নয়, সমাজ জীবনে জীবিকা নির্বাহ বা অর্থ উপার্জনের পথে হালাল এবং হারাম রয়েছে, ঠিক একই ভাবে অনলাইন জগতেও জীবিকা নির্বাহ বা অর্থ উপার্জনের পথে হালাল এবং হারাম রয়েছে।

সকলেই জানি, সুদ এবং ঘুষকে কঠোরভাবে হারাম করা হয়েছে। এই সুদ এবং ঘুষের ব্যপারটা আপনি যেভাবেই আঞ্জাম দেননা কেন এটা হারামই থেকে যাকে। অর্থাৎ সমাজ জীবনে সুদ এবং ঘুষ আনা-নেওয়া যেমন হারাম, অনলাইনেও সুদ এবং ঘুষের আদান-প্রদান হারাম।

বুঝার বিষয় হলো ইসলামী শরীয়তের আইন সব জায়গায় সমান। বাস্তব জীবনে জীবিকা নির্বাহের জন্য ইসলামী শরীয়ত যেমন দিকনির্দেশনা দেয়, অনলাইন থেকে ফ্রিল্যান্সির করে জীবিকা নির্বাহের জন্যও ঠিক একই ধরণের নির্দেশনা রয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল নাকি হারাম তা বুঝার জন্য চলুন মহাগ্রন্থের শরণাপন্ন হই। –

পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা হয়, তা তোমাদের জন্য বৈধ।

দৈনন্দিন জীবনে আমাদের প্রায় বেশীরভাগ ব্যবসাই পরস্পরের সম্মতিক্রমে হয়। তবে বিষয়টা এমন নয় যে, পরস্পরের সম্মতিক্রমে হলেই সব ব্যবসা হালাল হয়ে যায়। বর্তমান যুগে অধিকাংশ ব্যবসার মধ্যে হালাল ও হারাম রয়েছে। আপনাকে প্রথমত দেখতে হবে আপনি যেই ব্যবসা করছেন সেটা হালাল কিনা।

পড়ার সাজেশনঃ
অনলাইন ইনকাম | অনলাইন আয়ের সহজ উপায়
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কি?

মদ পান করা এবং মদের ব্যবসা করা হারাম। এই ব্যবসাটিও কিন্তু পরস্পরের সম্মতিক্রমেই হয়। এই বলে এটি হালাল হয়ে যাবে না। আমরা যারা অনলাইন থেকে ফ্রিল্যান্সিং করে অর্থ উপার্জন করি, তাদেরকে প্রথমত চিন্তা করতে হবে, অর্থ উপার্জনের জন্য আমরা যেই ক্যাটাগরির কাজ বা টপিক নির্বাচন করেছি তা হালাল কিনা।

ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল নাকি হারাম তা সহজে বুঝানোর জন্য উদাহারণ স্বরূপ আমরা গ্রাফিক্স ডিজাইন বা ওয়েব ডিজাইন নিয়ে কথা বলি। ইন্টারনেটে ফ্রিল্যান্সিং করে অর্থ উপার্জনের চাহিদাপূর্ণ যত কাজ বা ক্যাটাগরি আছে তার মধ্যে গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ওয়েব ডিজাইন সবার শীর্ষে।

সর্বসম্মতিক্রমে গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং ওয়েব ডিজাইন হালাল। তবে ক্ষেত্র বিশেষে এই কাজ গুলোই আবার হারাম। আপনি যদি গ্রাফিক্স ডিজাইন করতে গিয়ে ইসলামিক কোন পোস্টার ডিজাইন করেন, বা ওয়েব ডিজাইন করতে গিয়ে কোন জ্ঞানমূলক সাইট তৈরি করেন তবে এটা অবশ্যই হালাল।

আবার এর বিপরীতে আপনি যদি গ্রাফিক্স ডিজাইন করতে গিয়ে হারাম কাজের প্রসারের জন্য পোস্টার ডিজাইন করেন, বা হারাম কন্টেন্ট প্রচারের জন্য ওয়েব ডিজাইন করেন তবে এটা অবশ্যই হারাম হবে।

মনে রাখবেন, প্রত্যেক হালাল কাজের পারিশ্রমিক হালাল। আবার হারাম কাজের পারিশ্রমিক হারাম। কাজটি আপনি যেভাবেই সম্পাদন করেন না কেন, তা যদি পরস্পরের সম্মতিক্রমে হলাল পন্থায় হয় তবে এ থেকে উপার্জনও বৈধ বা হালাল হবে।

মনে করুন আপনার একটি মিষ্টির দোকান আছে। মিষ্টি যেহেতু খাদ্য, তাই আপনার ব্যবসার পাশাপাশি মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্যও শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি অনেক সওয়াব পাবেন। এটাও সত্য যে, মিষ্টির ব্যবসা হালাল।

কিন্তু আপনি যদি মিষ্টির ব্যবসা করতে গিয়ে মিষ্টি তৈরিতে গরুর মুত্র ব্যবহার করেন বা কোন হারাম পদার্থ ব্যবহার করেন, তবে আপনার মনে রাখতে হবে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া এবং হারাম পদার্থ ব্যবহার করার কারণে আপনার ব্যবসাটি হারাম হয়ে যাবে।

ঠিক একই ভাবে ফ্রিল্যান্সিং জগতটি পরিচালিত হয়। ”ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল নাকি হারাম” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজার আগে আপনাকে দেখতে হবে আপনি যেই বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং করতে চাচ্ছেন তা হালাল কিনা।

পড়ার সাজেশনঃ
অনলাইনে ইনকাম বাংলাদেশী সাইট
সাইবার ক্রাইম কি? বিশ্বব্যাপী কিছু হ্যাকিং পরিসংখ্যান

ফ্রিল্যান্সিং অবশ্যই হালাল। কারণ এটি একটি ব্যবসা। মহান আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। শরীয়তের ভেতরে থেকে আপনি যেভাবেই অর্থ উপার্জন করেন তা আপনার জন্য হালাল। কিন্তু শরীয়তের বাহিরে গিয়ে যেভাবেই উপার্জন করেন না কেন, তা হারাম বলেই সাব্যস্ত হবে।

গুরুত্বপূর্ণ কথাঃ

যেই ভাই-বোনেরা ”ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল নাকি হারাম” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন, তারা অবশ্যই আল্লাহর তাক্বওয়াবান বান্দা। হৃদয়ে আল্লহর ভয় আছে বলেই হালাল-হারামের পার্থক্য করতে চেয়েছেন। কেননা, এই যুগে হালাল-হারামের পার্থক্য কেউ করতে চায় না। যাইহোক,

মনে রাখতে হবে ব্যবসা হালাল হওয়ার জন্য যেমন হালাল বস্তুর প্রয়োজন, ঠিক একই ভাবে ফ্রিল্যান্সিং হালাল হওয়ার জন্য হালাল কন্টেন্ট এর প্রয়োজন। ফ্রিল্যান্সিংও একটি ব্যবসা। তবে এই ব্যবসাটি ইন্টারনেটের সাহায্যে ঘরে বসেই পরিচালনা করার জন্য তা “ফ্রিল্যান্সিং” শব্দে পরিচিতি পেয়েছে।

মোটকথা হলো, সব ব্যবসাকে যেমন একচেটিয়াভাবে হালাল বলা যাবে না। ঠিক একইভাবে ফ্রিল্যান্সিং নামক অনলাইন ব্যবসাকেও একচেটিয়াভাবে হারাম বলা যাবে না।

আমি আশা করছি ”ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল নাকি হারাম” এই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন। তবুও যদি এই বিষয়ে আপনার আরো জানতে ইচ্ছে হয় তবে নিকটস্ত এমন কোন আলেম সাহেবের শরণাপন্ন হন যিনি ইন্টারনেট সম্পর্কে জানেন।

আর হ্যাঁ, আপনার যদি কোন মতামত থাকে তবে অবশ্যই কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

NAZIRUL ISLAM NAKIB

যত জ্ঞান-ধন করেছি অর্জন জীবনের প্রয়োজনে,
তার সবটুকুই বিলাতে চাই সৃষ্টির কল্যাণে।

2 comments

error: Content is protected !!