সাইবার ক্রাইম। বিশ্বব্যাপী হ্যাকিং পরিসংখ্যান

সাইবার ক্রাইম কি? বিশ্বব্যাপী কিছু হ্যাকিং পরিসংখ্যান

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে পৃথিবীর প্রায় সব ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য বিভিন্ন সফটওয়্যার ও ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এই প্রযুক্তিগুলোর যেমন ভাল দিক রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে রয়েছে মন্দ দিকও। ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত যে কোন ধরণের বৈদ্যুতিক যন্ত্র সাইবার ক্রাইম বা হ্যাকিংয়ের শিকার হতে পারে। বিশেষ করে যন্ত্রে ব্যবহৃত সফটওয়্যার গুলো।

গুগল, অ্যামাজন ও ইয়াহুর মতো বড়-বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতে নানাভাবে হ্যাকিং এর শিকার হয়েছে। তাই তাদের প্রযুক্তিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিবছর তারা বিপুল অর্থ সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করে থাকে। তাই যে কোন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাইবার ক্রাইম কি

ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংঘটিত যত অপরাধ আছে, তার সবই সাইবার ক্রাইম এর অন্তর্ভুক্ত। সাইবার ক্রাইম মূলত এমন একটি বিষয়, যা বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করে করা হয়। যেমন, কম্পিউটার বা অন্য কোন ডিজিটাল ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র, যা ব্যবহার করে অপরাধীরা ইন্টারনেটের সাহায্যে বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধগুলো করে থাকে।

সাইবার ক্রাইমকে সাধারণত ৪ ভাগে বিভক্ত করা যায়

  1. ইনসাইডারস
  2. হ্যাকার
  3. ভাইরাস রাইটারস
  4. ক্রিমিনাল গ্রুপ ইত্যাদি।

উপরোল্লেখিত সাইবার ক্রাইম এর এই চারটি পদ্ধতি বিশেষ ভাগে উল্লেখযোগ্য।

আপনি যদি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে কোন বাণিজ্যিক প্রকল্প পরিচালনা করতে চান। তবে আপনাকে অবশ্যই সাইবার নিরাপত্তা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। যেমন: অনলাইনে ই-কোমার্স বাণিজ্য। এই বাণিজ্যটির কার্যক্রম সফটওয়্যার এবং প্রযুক্তির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এই ধরণের বাণিজ্যে পণ্য ও সেবার বিবরণ আয়-ব্যয়ের হিসাব সহ গ্রাহকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত থাকে। আপনি অবশ্যই চাইবেন না আপনার প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো কোন সাইবার ক্রাইম এর মধ্যদিয়ে হ্যাকারদের হাতে চলে যাক।

সাইবার ক্রাইম। বিশ্বব্যাপী হ্যাকিং পরিসংখ্যান

বিশ্বব্যাপী কিছু হ্যাকিং পরিসংখ্যান

McAfee – এর তথ্যমতে বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ হাজার ওয়েবসাইট ও সফটওয়্যার হ্যাক হয়ে থাকে। ২০২০ সালে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় পোর্টালে প্রকাশিত সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সমীক্ষায় দেখা যায়, বিগত ২ মাসে হ্যাকাররা প্রায় ৪৬ শতাংশ যুক্তরাজ্য ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট গুলোকে হ্যাক করার প্রচেষ্টা চালায়।

তাছাড়া, বিগত ০ বছরে ইয়াহু কয়েকবার সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। সর্বশেষ ২০৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রতিবেদনে তাদের তিন বিলিয়ন ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি যাওয়ার কথা স্বীকার করে। যা ছিল এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হ্যাকিং প্রচেষ্টা।

এছাড়াও REUTERS -এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, Equifax’s নামের একটি আমেরিকান কোম্পানি থেকে  ২ লক্ষ ৯ হাজার ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি হয়ে যায়। অন্য একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ  করা হয়, আরো প্রায় ৪ কোটি ব্যবহারকারীর নাম, জন্ম তারিখ ও আমেরিকান সামাজিক সুরক্ষা নম্বর হ্যাকাররা হাতিয়ে নেয়।

২০৮ সালের REUTERS আরও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে India’s Cosmos Bank থেকে ৯৪৪ মিলিয়ন রুপি হ্যাক হওয়ার খবর প্রকাশ করা হয়। হ্যাকাররা একটি ম্যালওয়ার ভাইরাসের আক্রমণ দ্বারা ব্যাংকটির এটিএম মেশিন গুলোর সার্ভার থেকে গ্রাহকদের তথ্য হাতিয়ে নেয়। প্রায় ৫ হাজার লেনদেনের মাধ্যমে ৮০৫ মিলিয়ন রুপি হ্যাকাররা উত্তোলন করতে সক্ষম হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০৮ সালের আগস্ট মাসের ১১ তারিখ।

এর ঠিক পাঁচ বছর পূর্বে ৩ সালে হ্যাকাররা Carbanal APT নামে একটি ম্যালওয়্যার ভাইরাস তৈরি করে। যে ভাইরাসটি দ্বারা হ্যাকাররা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ০০ টিরও বেশি ব্যাংকে আক্রমণ চালিয়ে ২০৪ সাল নাগাদ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে ২০৮ সালে সেই হ্যাকার গ্রুপের মাস্টারকে স্পেনের একটি শহর থেকে গ্রেফতার করা হয়। সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Kaspersky daily -এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছিল।

Birch Level Index -এর তথ্যমতে ২০০৯ সালের মার্চ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৪ বিলিয়নেরও বেশি সংরক্ষিত নথি বা ডেটা হ্যাকাররা হাতিয়ে নিয়েছে। Statista এর সূত্র মতে ২০০৯ সালে শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বাৎসরিক বাজেট ছিল ৫ বিলিয়ন ডলার। SECUTITY ম্যাগাজিন বলছে প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে ইন্টারনেটে কমপক্ষে একবার হ্যাকার আক্রমণ হয়ে থাকে।

এছাড়াও McAfee -এর মতে বিশ্বব্যাপী হ্যাকাররা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ লক্ষ ম্যালওয়ার ভাইরাস ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। ২০৮ সালে FORTUNE ম্যাগাজিনের এক সাইবার আক্রমণ পরিসংখ্যানে পাওয়া গিয়েছে, বেশীরভাগ ইন্টারনেট ভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো জানেই না যে, সাইবার আক্রমণ প্রতিহত করতে তারা প্রস্তুত কি না। এবং ৭৫% প্রতিষ্ঠান এই সাইবার আক্রমণকে নিষ্ক্রিয় করার অগ্রিম কোনো পরিকল্পনা নেই। আমরা যে সকল সফটওয়্যার, অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করছি, সেগুলো কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এখানে সে সকল প্রতিষ্ঠানগুলোর কথাই বলা হয়েছে।

সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ

যদিও সাইবার ক্রাইম বা হ্যাকিং পদ্ধতি গুলো শতভাগ ধারণা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে। তবে প্রচলিত কিছু পদ্ধতি সম্পর্কে আপনার অবশ্যই ধারণা থাকা উচিত।  বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হ্যাকাররা প্রায়ই ফিশিং পদ্ধতিটি ব্যবহার করে থাকে। এই পদ্ধতিতে তারা ইমেইল, ফোন নম্বর সহ অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সাহায্যে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ভাবে লোভনীয় অফার প্রদান করে। যেমন: লটারি, পুরস্কার জেতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাস্টমার সাপোর্ট প্রতিনিধি হিসেবে যোগাযোগ করা সহ এমন আরো নানা প্রক্রিয়া তারা অবলম্বন করে সাধারণ মানষের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেয়।

এছাড়া হ্যাকাররা বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রিমিয়াম সফট্ওয়ারে ম্যালওয়ার ভাইরাস যুক্ত করে তা ফ্রীতে ডাউনলোড করার সুযোগ দেয়। যেগুলোকে আমরা ক্র্যাক বা পাইরেটেড সফটওয়্যার বলে থাকি। অনেকেই সে সকল প্রিমিয়াম সফটওয়্যার গুলো তাদের ওয়েবসাইট, কম্পিউটার বা ফোনে বিনামূল্যে ব্যবহার করার আশায় ডাউনলোড করে নেয়। এভাবেই সাধারণ ইউজারের বিভিন্ন তথ্য হ্যাক হয়। এই পদ্ধতি ছাড়াও হ্যাকাররা আরো বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে।

সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তারা সফটওয়্যারগুলো অত্যন্ত স্বল্পমুল্যে অনলাইনে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমে বিক্রয় করে। স্বল্পমূল্যে পেয়ে অনেকেই সেই ফাঁদে পা দেয়ার মাধ্যমে হ্যাকিংয়ের শিকার হয়ে যায়। এগুলো প্রচলিত সাইবার অপরাধের কিছু পদ্ধতি সমূহ মাত্র। এমন আরো নতুন নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নিতে হ্যাকাররা সর্বদাই সক্রিয়।

সাইবার নিরাপত্তা বা হ্যাকিং থেকে বাঁচতে করণীয়

আকস্মিক লটারি জাতীয় লোভনীয় অফার এর লিঙ্ক এ ক্লিক করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অবিশ্বস্ত ওয়েবসাইট থেকে প্রিমিয়াম সফটওয়্যারগুলো ফ্রিতে ডাউনলোড করে ব্যবহার করা উচিত নয়। এমনকি স্বল্পমূল্যে ক্রয়ের সুযোগ পেলেও তা থেকে বিরত থাকতে হবে। সব সময় আসল প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট স্টোর থেকেই সফটওয়্যার ক্রয় করা উচিত।

সফটওয়্যারও একটি প্রোডাক্ট। সত্যিকারের অথর থেকে যে কোনো ধরণের প্রোডাক্ট ক্রয় করলে অরিজিনিয়াল প্রোডাক্ট পাওয়া যায়। পাশাপাশি এই ধরণের প্রোডাক্ট থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনার সম্মুখিন হতে হয় না। হ্যাকিং থেকেও সুরক্ষিত থাকা যায়।

আমাদের কথাঃ

সাইবার ক্রাইম বা হ্যাকিং আক্রমণ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আপনি যদি অনলাইনে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চান, তবে আপনাকে পুরোপুরি ভাবেই সঠিক নিয়মে কাজ করতে হবে। এবং সব ধরণের অরিজিনিয়াল প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে হবে। আশাকরি এই বিশ্বব্যাপী হ্যাকিং পরিসংখ্যান দেখে হয়ত একটু সচেতন হবেন।

👉 সবাইকে সচেতন করতে বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করে দিন। ধন্যবাদ

Add comment