তারাবির নামাজ

দশম বারের মতো তারাবির নামাজ পড়ালাম | নাজিরুল ইসলাম নকীব

পবিত্র রমজান মাস কখন আসবে প্রতিটি মুসলমানই তার প্রতিক্ষায় থাকে। রমজান মানেই মুসলমানদের বিশেষ একটি আনন্দের মাস। দীর্ঘ ৩০ দিন দিনের বেলায় রোজা আর রাতের তারাবির নামাজ প্রতিটি মুসলমানকেই বিমুগ্ধ করে তোলে।

রমজান পবিত্র কুরআন নাজিলের মাস। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর সুন্নত অনুযায়ী রমজানে ফরজ সালাতের পাশাপাশি ২০ রাকাত তারাবির সালাত আদায় করতে হয়। দীর্ঘ এগারো মাসের বিশেষ প্রস্তুতিতে হাফেজ সাহেবগণ তারাবির নামাজের ইমামতি করেন। সুরেলা কণ্ঠের তিলাওয়াত নামাজে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়।

আলহামদুলিল্লাহ!
দশম বারের মতো আমিও তারাবির নামাজ পড়ালাম। ২০১০ সালের নভেম্বর মাসের ১০ তারিখে পরাক্রশালী দয়াময় আল্লাহর ঐশী কিতাবের মূখস্তকরণ সমাপ্তি করে ছিলাম। আমার মতো কমবক্তাকে আসমানী কিতাবের জ্ঞান হৃদয়ে ঢেলে দেওয়াটা আল্লাহর অসীম কৃপা ছাড়া আর কিছুই না!

তার পর থেকেই তারাবির নামাজ পড়ানো শুরু করি। প্রথমত নিজ বাড়িতেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তারাবির নামাজ পড়ি। তখন বয়সে ছোট হওয়ার কারণে মসজিদে তারাবিহ পড়ানোর জন্য অনেকেই অনুৎসাহিত করেছিল। তাই নিজ বাড়িতেই বছর তারাবিহ পড়াই। এটাও ছিল একটি সৌভাগ্যের বিষয়। বাড়িতে তারাবিহ পড়ানোর পর থেকে পরিবারের সদস্যরা প্রতি বছরই আমার ইমামতিতে তারাবিহ পড়ার জন্য বায়না করতো, এখনো সেই বায়নায় এক এক করে বছর কেটে যায়। তবে এখন আর পরিবারকে সাথে নিয়ে তারাবিহ পড়ানোর সেই সৌভাগ্য হয় না। যাইহোক,

পরবর্তী বছরে মসজিদে তারাবিহ পড়ানোর উৎসাহ পাই আমার নিজ পরিবার থেকে। সবচেয়ে বেশী উৎসাহ যার কাছ থেকে পেয়েছিলাম তিনি আমার শ্রদ্ধেয় মরহুম দাদা মো. আবু বকর সিদ্দিক ( জরি) সাহেব। তাঁর আদর এবং প্রচেষ্টায় আমি কুরআনের জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি এবং পবিত্র রমজানে মসজিদে তারাবিহ পড়ানোর সুযোগ পাই।

সুযোগ পেলেও মনে কোন সাহস যোগাতে পারছিলাম না তখন। কারণ, দাদার সিলেক্টেড মসজিদটি কোন ছোট মসজিদ ছিল না; ১০০+ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী “আজীম হাজি জামে মসজিদ। সেটা বৌলাই ইউনিয়নের সেন্ট্রাল মসজিদ। তখন মসজিদটিতে বিশাল বিশাল ৩ টি গুম্বুজ ছিল। যার মিহরাব ছিল ছোট, তবে এই মিহরাবে দাড়িয়ে শত শত মানুষকে নিয়ে তারাবির নামাজের ইমামতি আমাকে করতে হবে, এটার জন্য আমি কিছুতেই প্রস্তুতি নিতে পারছিলাম না। আমার দাদা আমাকে তখনই উৎসাহ দিয়েছিলেন। এভাবেই শুরু করলাম তারাবিহ…।

এখানেই একটানা দীর্ঘ ৬ বছর তারাবির নামাজের ইমামতি করি। তবে প্রথম দিকে বয়সে ছোট হওয়ার কারণে ৪/৬ রাখাতের বেশী পড়ানোর সাহস যোগাতে পারিনি। সাথের পার্টনার বাকিটা সামলে নিতো। তখন নামাজে দাঁড়ালেই বুক থরথর করে কাঁপতো! মাঝে মাঝে তিলাওয়াত করতে গিয়ে মুখে ঝড়তাও কাজ করতো। একবছর অতিবাহিত হওয়ার পর আলহামদুলিল্লাহ নিজের স্বকীয় সাহস বৃদ্ধি হতে লাগলো। এভাবেই দীর্ঘ ৬ টি বছর একই মসজিদে কেটে গেলো। বর্তমানে মসজিদটির নাম ‘আজীম হাজী কমপ্লেক্স মসজিদ’।

তারপর মনে হলো, অভিজ্ঞতার জন্য হলেও মসজিদ পরিবর্তন করা জরুরি। কারণ, তখনকার আমার সমবয়সী বন্ধুদের মাঝে অনেক হাফেজ বন্ধু ছিল, যারা বিভিন্ন মসজিদে তারাবিহ পড়ানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তখন আমি তাদেরকে কম্পিটিটর হিসেবেই মনে করি এবং মসজিদ পরিবর্তনে আগ্রহী হই।

চলে এলো ২০১৭ সাল। আমার এক বন্ধু হাফেজ উবাইদুল্লাহ  সা’দ-এর  পরামর্শে নতুন একটি মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ানোর জন্য এপ্লাই করি, এবং সেই মসজিদে উত্তীর্ণও হই। তখন সেই মসজিদের পেশ ইমাম হিসেবে বন্ধু উবাইদুল্লাহ সা’দ নিজেই খেদমতরত ছিল। এখানে কেটে গেল আরোও টি বছর।

তারপর পুণরায় (২০১৮ -২০১৯) ‘আজীম হাজী কমপ্লেক্স মসজিদের কমিটি কর্তৃক কয়েকবার তারাবিহ পড়ানোর সুপারিশ করা হলেও তাতে আর সম্মতি হয়নি। কারণ, ২০১৮ সালের রমজানে সামান্য অসুস্থ ছিলাম এবং আমার ওয়েব ডিজাইনের ক্লাস চলছিল। সে বছরের পুরোটা সময়ই এডভান্স কোডিং অভিজ্ঞতার জন্য পরিশ্রম করেছি।  ২০১৯ সালে একই অবস্থা চলছিল। ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের পিপাসা অনুভব করলাম, আগে থেকেই মোটামুটি অভিজ্ঞতা থাকার কারণে বেছে নিলাম এসইও [SEO]। রমজানের অনেক আগে থেকেই এসইও [ SEO ] সম্পর্কে বিভিন্ন ক্লাসে জয়েন করি। এভাবে প্রায় ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে চলে আসি।

নেমে এলো করোনা মহামারি। করোনার মধ্যদিয়েই গতবছর (২০২০ সালে) তারাবিহ পড়িয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ এবছরও তারাবিহ পড়াচ্ছি। তবে করোনা মহামারির মাধ্যদিয়ে তারাবির নামাজ পড়ানোর অভিজ্ঞতা পুরোই ভিন্ন। করোনা মহামারি ঠেকাতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা লকডাউনের কারণে তারাবির সালাতে মুসল্লি সংখ্যা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে তারাবিহ পড়তে হচ্ছে।

পরাক্রশালী দয়াময় আল্লাহ যেনো জীবনের বাকিদিনগুলো মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের খেদমতে আমাকে কবুল করেন। সকল বন্ধুদের কাছেই দোয়া চাই। সবাইকেই রমজানের শুভেচ্ছা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকেই সঠিকভাবে সিয়াম পালনের পাশাপাশি রমজানের বাকি আমলগুলো করার তাওফিক দান করুন। আমিন!

-নাজিরুল ইসলাম নকীব। কিশোরগঞ্জ

2 comments