বৃষ্টি ভেজা সোনালী অতীত

খুঁজে ফিরি বৃষ্টি ভেজা সোনালী অতীত

খুঁজে ফিরি বৃষ্টি ভেজা সোনালী অতীত || বৃষ্টির দিনগুলো আমরা সবাই উপভোগ করি। বৃষ্টি আসলে আবহাওয়া যেমন শীতল হয়, তেমনি আমাদের হৃদয়ও শীতল হয়। বৃষ্টিতে ভিজে স্কুল থেকে ফেরা শৈশব-কৈশর জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। বৃষ্টিতে ভিজে, বৃষ্টির পানির পরশ পাওয়া এক অসাধারণ অনুভূতি।

কিন্তু সময়ের বিবর্তনে বর্তমান সময়ের শহরে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম এই অনুভূতি গুলো গ্রাফিক্যাল মাল্টিমিডিয়া কিংবা গল্পতেই দেখতে পাবে। তাদের বাস্তব অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা নেই বা হবে না বললেই চলে। অনেকের শৈশবের বেড়ে ওঠা ও তাঁর ছেলে মেয়ে দের কাটানো শৈশবের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

এই সময়ের শৈশব-কৈশর গুলো কাটে প্রযুক্তির সাথে আর আমাদের সময়টা কেটেছে প্রকৃতির সাথে। প্রকৃতি আর আমরা একাকার হয়ে মিশে গেছি। আর বর্তমানের প্রজন্ম প্রযুক্তির বাহিরে নিজেদের নিতেই চায় না। বুঝতে চায় না প্রকৃতির নিগুঢ় রহস্য।

বৃষ্টির দিনে বাড়ির উঠানের কাঁদা পানিতে লেপটানো কিংবা পিছলা খেলা (আচার খাওয়া বা পড়ে যাওয়া) কতই না আনন্দের সাথে উপভোগ করেছি। বৃষ্টির দিনে হঠাৎ পিছলা খেয়ে পড়ে যাওয়া ছিল আমাদের গ্রামীণ জীবনের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। পরে গিয়ে কেউ কেউ অনেক সময় মারাত্মক ভাবে আহত পর্যন্ত হয়ে যেতেন।

রাস্তাঘাট ছিল, আবার কোন কোন এলাকায় ছিল না। যে সকল এলাকায় রাস্তাঘাট ছিল, তাও সেগুলো কর্দমাক্ত হয়ে থাকত। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক পথ চলতে প্রচুর কষ্ট হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে রাস্তাঘাটের কতই অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে।

বৃষ্টি ভেজা দিন

বৃষ্টি হলে মাছ ধরা ছিল আরেকটি সুখের অধ্যায়। এর আনন্দ ও স্বাদ দুটোই উপভোগ করা হয়। বৃষ্টিতে ভিজে মাছ ধরা কি যে আনন্দের! প্রবল বৃষ্টির দিনে পানির স্রোতের মাঝে মাছের ধুম পড়ে যায়। পুকুর, নালা, খাল-বিল থেকে মাছ কৃষি জমিতে ছড়িয়ে যায়। যে যার মতো মাছ ধরে। প্রায় সময়ই সবাই বৃষ্টিতে ভিজে মাছ ধরতে যায়।

তখন প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। আঞ্চলিক ভাষায় আমরা বলি ’উজাইনা মাছ’। আর উজাইনা মাছের ভাজি কি যে স্বাদ!! বিশেষ করে ছোট ছোট দারহিনা (আঞ্চলিক নাম), পুঁটি, কই, টাকি, টেংরা, শিং, মাগুর ও শোল উল্লেখযোগ্য ছিল। যার স্বাদ ঐ চাইনিজ কিংবা থাই বা বিদেশী সব স্টাইলের খাবার থেকেও সেরা। আর পুষ্টি গুনাগুন নাই বা বললাম।

বর্তমানেও বৃষ্টি হলে গ্রামীণ জনপদে মাছ ধরার হিড়িক পড়ে যায়। তবে আগের মতো এখন আর তেমন মাছও পাওয়া যায় না এবং সবাই আগের আমেজ নিয়ে মাছ ধরতে যায় না। পরিবর্তন শুধু শহরে জীবনেই আসেনি, পরিবর্তন এসেছে আমাদের গ্রামীণ জীবনধারাতেও।

বৃষ্টিতে ভিজে আম, জাম কুড়ানো বর্তমান সময়ের থ্রিডিগেমসের চেয়ে বেশি উপভোগ্য ছিল। এ বাড়ি ও বাড়ির ছোট ছেলে মেয়েরা একসাথে হৈ-হুল্লোড় আর চিৎকার চেঁচামেচি করার শব্দ, সাথে বৃষ্টির ঝোপ ঝোপ শব্দ একাকার হয়ে যেত। সবাই মিলে বৃষ্টির দিনে পুকুরে গোসল করা, সাঁতার কাটা, পুকুরের এ মাথা হতে ও মাথায় ডুব দিয়ে পাড় হওয়া কত যে আনন্দের ছিল তা বলে কিংবা কোন ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

রিম ঝিম বৃষ্টি পড়ার শব্দ টিনের চালে যে মৃদু তরঙ্গের সুর তুলে, কাঁথা মুড়ি দিয়ে সেই সুরের মোহনায় হারিয়ে যাওয়া কিংবা সুরের তালে তালে কল্পনার রাজ্যের পরীদের নৃত্য অবলোকন করা সুখের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়।

প্রায় সময়েই বৃষ্টির পর আকাশে রংধনু উদিত হয়। আর রংধনু দেখার দৃশ্য যে অসাধারণ অনুভূতি জাগ্রত করে তা কি দিয়ে প্রকাশ করবো? বিশেষ করে বড়রা আমাদের ছোটদের কে বলতো- “এই দেখ, আকাশে রংধনু ভাসছে।” আমরা আনন্দে লাফিয়ে নেচে উঠতাম এবং যে দিকে ইশারা করতো সেদিকে তাকিয়ে দেখতাম।

খুঁজে ফিরি বৃষ্টি ভেজা সোনালী অতীত

এছাড়া আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে একজন আরেকজনকে ঝাপটিয়ে ধরে মাটিতে শুয়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ চমকানোর বিকট শব্দে কেউ কেউ আবার প্রচুর ভয় পেয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দেওয়া কত স্মৃতিই না জড়িয়ে আছে বৃষ্টির সাথে।

আকাশ মেঘলা হলেই মনের কোণে আনন্দ ও সুখ পাখিরা নাচানাচি শুরু করত। আজ যেন প্রচুর বৃষ্টি হয়; তবে অনেক আনন্দ হবে- মনে মনে এই কামনা শুরু হয়ে যেত। বৃষ্টি হলেই যে হৈ-হুল্লোড়, উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে মনের আনন্দে, কিছু সময় হারিয়ে যাওয়া যাবে, পুকুরের কুসুম গরম পানির রাজ্যে। বৃষ্টিতে পুকুরের পানি উত্তপ্ত হয়ে উঠে, যার স্পর্শ শরীরে অন্যরকম প্রাণের সঞ্চার করে।

এখন শরীরে বৃষ্টির পানি পড়লে বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে ভর করে। কিন্তু পূর্বে এই বৃষ্টির সাথে কতই না মিশে গিয়েছি। তেমন কোন অসুখ-বিসুখ আক্রমণ করতে পারেনি। তবে অতিরিক্ত কিংবা অতিমাত্রায় বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হওয়ার ঘটনা বিরল কিছু নয়।

কত দুরন্তপনার মধ্য দিয়ে আমাদের শৈশব ও কৈশর গুলো আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি। শুধু বৃষ্টির দিনে আমাদের শৈশব কালীন সময়টা যে কত উপভোগ্য ও সুখের কেটেছে তা লিখতে গেলে লেখার কলেবর অনেক বড় হয়ে পড়বে নিশ্চিত।

তবে আজ এই শহরে জীবনে বসে বৃষ্টির দিনের কথা ভাবতে গেলে শুধুই স্মৃতি গুলো খুঁজে ফিরি। তবে বৃষ্টির দিনের স্মৃতিচারণ সত্যিই হৃদয়কে কে আন্দোলিত করে। মনের মাঝে পুরানো দিনের স্মৃতির শিহরণ দোল দিয়ে যায়।

তাই বলি-

বৃষ্টি আয় আয়,
ঠিক বিকেলে,
পূবের কোনে,
মনের আঙ্গিনায়।

হৃদয় গগনে,
মনের বাগানে,
প্রাণের সঞ্চারনায়,
বৃষ্টি আয় আয়।

হৃদয়ের ভাবাবেগ জেগে উঠে বৃষ্টির ছোয়ায়। দেহে, প্রাণে, চিন্তায়, ভাবনায় ও স্বপ্নে শুধু একটাই চাওয়া, পরম আবেশের নরম ছোঁয়া।

লেখকঃ-
মো. ইসমাঈল হাসান তানজির
চতুর্থ বর্ষ, বিএসসি (হন্স) ইন কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা।

Add comment