বিজ্ঞানে মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার কারণ

বিজ্ঞানে মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার কারণ

বিজ্ঞানে মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার কারণ : বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা শুরু হয় বিভিন্ন মুসলিম মনীষীদের হাত ধরেই। অথচ প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে ধারণা করা হয় জ্ঞানবিজ্ঞানে সবচেয়ে পিছয়ে মুসলিম সম্প্রদায়। সপ্তম শতক হতে ষোড়শ শতক পর্যন্ত প্রায় হাজার বছরেরও অধিক সময় পুরো পৃথিবীর সামগ্রিক আধিপত্য মুসলিমদের হাতে ছিল। মুসলিম ঐক্য, সমপ্রীতি ও জ্ঞানবিজ্ঞানে যুগোপযোগী ঋদ্ধতাই ছিল বিশ্বপ্রভাবের অন্যতম কারণ। কিন্তু বর্তমানে তার পুরোটাই উল্টো মনে হয়।

সংকীর্ণ স্বার্থ চিন্তা ও দুনিয়ামুখী আচার আচরণেই ভ্রাতৃত্বের ফাঁটল

রাস্ট্রীয় পর্যায়ে, ব্যক্তি পর্যায়ে, আত্মীয় ও বন্ধু পর্যায়ে মুসলমানদের মাঝে হিংসা বিদ্বেষ খুব বেশী পরিমাণে ছড়িয়ে গেছে। এমনকি ভাই-বোনের সম্পর্ক থেকেও অনেক মুসলমান আজ উদাসীন। দলে দলে বিভক্ত হওয়ার করণেই মুসলিম জনগোষ্ঠির শক্তি সব দিক থেকেই খাটো হয়ে আসছে।

আমরা সকলেই জানি, ভারত বিভাজনের কারণে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত ভেঙে পাকিস্তান অধিরাজ্য ও ভারত অধিরাজ্য নামে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করা হয়। এর মাঝে যদিও ধর্মীও কারণ ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো মুসলিমরা যেনো ঐক্য বোঝে না।

নিজ সংকীর্ণ স্বার্থ চিন্তায় ও দুনিয়ামুখী আচার আচরণেই ভ্রাতৃত্বের মাঝে বিশাল ফাঁটল সৃষ্টি করেছে। নইলে ভারত ২৯ টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে এতদিন একসাথে থাকতে পারলে পাকিস্তান কেন দুটি রাজ্য নিয়ে একদিনের জন্যও ভালোভাবে থাকতে পারল না! পাকিস্তান কেন পূর্ব বাংলার উপর জুলুমের বোঝা ছাপিয়ে দিল? পূর্ব বাংলাও তো পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য ছিল। তাছাড়া পূর্ব বাংলার মানুষও তো মুসলমান ছিল।

জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ‘জন সমর্তন’ অনেক বড় একটি বিষয়। কিন্তু সময়ের আবর্তনে আজ মুসলমান জাতি গোষ্ঠির প্রতি জোড়ালো কোন সমর্থন নেই। হোক সেটা রাস্ট্রীয় পর্যায়ে, ব্যক্তি পর্যায়ে, আত্মীয় বা বন্ধু পর্যায়ের সমর্থন। এভাবেও মুসলিম সমাজের ঐক্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে অনেক মুসলমান আছে, যারা প্রতিনিয়তই ইহুদিবাদের চক্রে মার খাচ্ছে। অথচ তাদের ব্যপারেও আরেক মুসলমান ভাই উদাস। ঐক্য বিনষ্টের কারণেই বিভিন্ন ভাবে মুসলিমদের মাথা নত হতে চলছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানে গবেষণা ও তথ্য সঞ্চয়ের অভাব

মহাগ্রন্থ আল কুরআন, স্রষ্টা প্রদত্ত বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ বই। মুসলমান হিসেবে প্রায় সকলেই কুরআন পড়তে জানি। বিভিন্ন মাহফিল বা বিজ্ঞ আলেম উলামাদের কাছ থেকেও কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও ইতিহাসের আলোচনা শুনে থাকি। কুরআনে বর্ণিত জান্নাত, জাহান্নাম, সুন্দর জীবন গঠন ও কবরের আলোচনা গুলোই মুসলিম সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের সাথে পরিচিত।

তবে কুরআনিক সায়েন্স বা কুরআনে বর্নিত বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো তোলে ধরার মতো যথেষ্ট আলোচক নেই বলেই মুসলিম সমাজেও বিজ্ঞানময় কুরআনের আলোচনা হয় না। তাছাড়া, কেমন জানি মনে হয় বিজ্ঞজনরাও কুরআনিক সাইন্স নিয়ে আলোচনার বিষয়টি পাশ কাটিয়ে নিতে চায়! এজন্যই কুরআন বিচ্ছিন্ন সমাজে বসবাসরত অনেকেই মনে করে বিজ্ঞান বলতেই বিধর্মীও কোন কর্ম বা সৃষ্টিকে বুঝানো হয়। অথচ, মহান আল্লাহ কুরআনের সূরা ইয়াসিনের ২ নং আয়াতে কুরআনকে ”বিজ্ঞানময় কুরআন” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আসলে আমরা কুরআন নিয়ে গবেষণা করিনা। যারা গবেষণা করে তাদেরকেও উৎসাহিত করিনা। সবচেয়ে বড় কথা হলো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কুরআনিক সায়েন্স রিলেটেড গবেষণা কেন্দ্র নেই। রাস্ট্রীয় বা ব্যক্তি উদ্যোগের এমন ব্যবস্থা নেই। আমরা যারা কুরআন নিয়ে পড়াশোনা করি বা করেছি, প্রায় সকলেই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে ক্লাসের পাঠ্যবই বা এর বাহিরের কিছু কিতাবাদি নিয়েই গষেণার ইতি টেনে দিই। এর পেছনে অবশ্য অর্থ বা ব্যক্তি জীবনের প্রতি জোড়দারের একটি প্রভাব কাজ করে। তবে একথা সত্য যে , এভাবেই গবেষণা ও তথ্য সঞ্চয়ের অভাবে যুগের পর যুগ ধরে আমরা পিছিয়েই যাচ্ছি। এর প্রতি অবশ্যই আমাদের নজর দেওয়া জরুরি।

মুসলিম সমাজে প্রচলিত কুসংস্কৃতির বেড়াজাল

সমাজের প্রতিটি জনগোষ্ঠির মাঝেই কিছুনা কিছু কুসংস্কৃতি বিদ্যমান। মুসলিম সমাজেও তার ব্যতিক্রম নয়। অনেকেই মনে করে কুরআন বিজ্ঞানকে সাপোর্ট করে না। কুরআন শুধু এসেছে হেদায়েদ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার জন্য। কুরআনে আর কিছুই নেই। আবার অনেকেই মনে করে কুরআন শুধু তাবিজের কাজে ব্যবহার করার জন্য এসেছে। অথচ নিজেরা কখনই কুরআন তিলাওয়াত করে না। এমন অনেকই আছে, কুরআন পড়তেও জানেনা। গবেষণা তো দূরে থাক..।

আধুনিক বিজ্ঞান নিয়েও অনেকের মনোবিরোধ / ব্যক্তিবিরোধ রয়েছে। সমাজে এমনও কথা প্রচলিত আছে, ”কম্পিউটার, স্মার্টফোন যেহেুতু বিধর্মীদের তৈরি; সেহেতু এগুলো মুসলমানরা ব্যবহার করতে পারবে না। এগুলো মুসলমানদের জন্য হারাম।” আচ্ছা বলুন তো, এসব ভিত্তিহীন কথাগুলো দিয়ে দুর্বল ঈমানদ্বারদের মাঝে ইফেক্ট তৈরি করা কি মোটেও যুক্তিযোগ্য? উত্তর ’অবশ্যই না’। তবে এসব কথা কেন বলা হয় জানেন? বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করলে এসব কথার মানেই হলো মুসলিমদেরকে হেয় পতিপন্ন করা। আধুনিক টেকনোলজি থেকে মুসলিমদের দূরে সরিয়ে দেয়ার পাঁয়তারা কেবল।

মিডিয়ার কারচুপিতে মুসলিম বিশ্বের অবক্ষয় !

কোন মুসলিম রাস্ট্র যদি কোন কিছু আবিস্কার করে তবে সেটা তাদেরই অভ্যন্তরে থেকে যায়। কেউ তাদেরকে উৎসাহ দেয় না। তাদেরকে নিয়ে সচারাচর নিউজ বা প্রচার হয় না। বিজ্ঞানের অনেক বড় বড় বিষয় আছে, যা কেবল মুসলিম মনীষীদের হাত ধরেই হয়েছে।

আজ সেই মনীষীদেরকেও ভুলে গেছি! আল ফারবি, ইবনে সিনা, আল কিন্দি, আল রাযি মনীষীদের মাঝে কার কি অবদান এটাও বেশীরভাগ মানুষের জানা নেই। এসব ঘটে যাওটার বড় একটি কারণ ’মিডিয়া’। মিডিয়ার জন্মলগ্ন থেকেই একটি জাতি মুসলিমদের বিপরীত অবস্থানে। বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান ও মুসলিম মনীষীদেরকে তারা সবসময় আঁড়াল করতে চায়। এজন্যই আজ অনেকেই মনে করে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় মুসলমানদের কোন অবদান নেই।

আশাকরি ‘বিজ্ঞানে মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার কারণ’ সম্পর্কে অবগত হতে পেরেছেন। এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অবশ্যই মুসলমানদেরকে চোখ, কান খোলা রেখে সচেতন হতে হবে।

মোটকথাঃ

মুসলিম সমাজকে সবদিক থেকেই সমৃদ্ধ করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অবশ্যই বিজ্ঞানময় কুরআনের বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো নিয়ে গবেষাণার পাশাপাশি রিলেটেড তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সমাজ থেকে কুসংস্কার নির্মূল করতে হবে। মিডিয়া জগতে মুসলানদের অবশ্যই আসতে হবে। ইসলাম প্রচারে নিজেদের জনমত তৈরি করার পাশাপশি প্রযুক্তি বিজ্ঞানেও অবদান রাখতে হবে। তবেই মুসলিম জনগোষ্ঠি আবরো বিশ্বজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে ইনশাআল্লাহ।

– নাজিরুল ইসলাম নকীব | কিশোরগঞ্জ

Add comment