আজ রাজত্ব কার?

বলো আজ রাজত্ব কার?

পরম করুণাময় মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। শান্তি ও রহমত বর্ষিত হউক প্রিয় নবী (সা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর, সমস্ত সাহাবায়ে কেরামের উপর। পৃথিবী আজ থমকে গেছে। পৃথিবীর গতি স্লথো হয়ে এসেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা যখন তড়-বড় করে উন্নতির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করছি।

যখন বিশ্বটাকে গ্লোবাল ভিলেজ এর আওতায় এনে স্মার্টফোনের মাধ্যমে হাতের মুঠোই সীমাবদ্ধ করেছি। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগীতার অসুস্থ মানসিকতায় যখন রাষ্ট্রগুলো মরিয়া। বিশ্ব যখন 4 জি থেকে 5 জি তে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গোটা পৃথিবী যখন মানুষের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে মেশিন ল্যাংগুয়েজের ব্যবহার করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুকছে।

বিভিন্ন ডিভাইস যখন আমাদের দেহে, মনে, প্রাণে এবং অনুভূতিতে জায়গা করে নিয়েছে। সবাই যখন নিজেদের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিযোগীতায় মত্ত রয়েছে। ঠিক সেই সময়ে সব কিছুকেই উলট-পালট করে দিয়ে আগমন হলো কভিড-19 অদৃশ্য ভাইরাস। যার নাম করোনা। ফলশ্রুতিতে, আজ কোথাও কোন রকমের জনসমাগম নেই। সবাই এক রকম উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার মধ্য দিয়ে দিনানীপাত করছে।

পবিত্র নগরী মক্কা ও মদীনায় মুসল্লীদের আগমনে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। ধর্মীয় উপসানালয় মসজিদ, গির্জা, মন্দির ও প্যাগোডায় মানুষের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পর্যটক দিয়ে গিজগিজ করা সমুদ্র সৈকত গুলো আজ বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। পর্যটন কেন্দ্রগুলো পর্যটক শুন্যে হাহাকার করছে। স্টক একচেঞ্জ বা বৈশ্বিক মার্কেটপ্লেস গুলোর অর্থনীতিতে ধস নেমেছে।

24 ঘন্টা আনন্দ উৎসবে মত্ত থাকা নগরী গুলো হয়ে গেছে জনশূন্য। বাতিল করা হয়েছে বিশ্বের সকল দেশের ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট এটেন্ডেন্স। নামিদামি 5স্টার ক্লাব, বার, হোটেল, রেস্টুরেন্ট গুলো বন্ধ হয়ে গেছে। নেই রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম। নেই বিপনীবিতান গুলোতে ক্রেতাদের ভীড়। সবল দুর্বলের উপর ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে না। থেমে গেছে বোমা নিক্ষেপ করে অসহায় নিরস্ত্র মানুষ হত্যার মহড়া।

করোনা ভাইরাস

নেই প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক ইস্যু নিয়ে আন্দোলনের মিটিং, মিছিল বা সমাবেশ। সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। সব কিছুই স্থবির হয়ে আছে। থেমে গেছে সব উন্নয়নমূলক কাজ। অগ্রগতিতে ভাটা পড়েছে। সবকিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে। গবেষণাগার গুলো ভ্যাকসিন তৈরিতে মরিয়া। কিন্তু ভ্যাকসিন তৈরিতে পুরোপুরি সফলতা আসছে না। কোন কোন গবেষণায় আশার আলো জ্বালাচ্ছে আবার অন্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় তা নিভেও যাচ্ছে।

প্রায় বিশ্বের সব দেশ লকডাউন এর আওতায় চলে এসেছে। স্থবির গোটা পৃথিবী। স্তব্ধ সকল পরাশক্তি। যেখানে সুপারিওর পাওয়ার বলতে কিছুই নেই। সব পরাস্থ। সবাই ভীত, শঙ্কিত ও আতংকগ্রস্থ। পৃথিবী দেখছে মৃত্যুর মিছিল। একের পর এক মৃত্যু সবাইকে থমকে দিয়েছে। কোথাও কোথাও লাশ সৎকারের জন্য জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। এক রাষ্ট্রপ্রধান বলে ছিলেন- “আকাশের (সৃষ্টিকর্তার) দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।”

চার লক্ষের অধিক মৃত্যু দেখছে বিশ্ব। যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আক্রান্তের সংখ্যার হিসেবটা অর্ধ কোটির উপরে। আশার কথা হচ্ছে, অনেকেই সুস্থও হয়ে উঠেছেন। এসবের মূলে রয়েছে কভিড-19 অদৃশ্য করোনা ভাইরাস। যা একটি ছোয়াছে রোগ। মানুষ হতে মানুষে সংক্রমণ হয় খুবই সহজে। তাই, এত বিপর্যয়।

অর্থনীতি ও জীবনমান এর কথা চিন্তা করে অনেক দেশ আস্তে আস্তে লকডাউন তুলে নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা “হু” এমন সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বলে অভিহিত করছেন। প্রায় সবকিছুতেই অনুমতি মিলছে তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। খুলে দেওয়া হয়েছে পবিত্র মক্কা ও মদীনা নগরী মসজিদ সহ সকল ধর্মীয় উপসানালয়।

আমাদের প্রিয় জন্মভূমিও এই লকডাউনের আওতায় ছিল। তবে সরকার পরীক্ষামূলক ভাবে লকডাউন শিথিল করার ঘোষণা দিলেও সব কিছু স্বাভাবিক হতে আরও বহু সময় অতিক্রান্ত করতে হবে। সত্যি, এ কভিড-19 অদৃশ্য করোনা ভাইরাস আমাদেরকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে। বিশেষ করে আমরা অনলাইন মিডিয়া ও খবরের কাগজে দেখেছি- করোনা সন্দেহে আপন মাকে ছেলে জঙ্গলে রেখে এসেছে। স্থানীয় ইউএনও ও প্রশাসনের সহায়তায় ঐ মাকে উদ্ধার করা হcorona virusয়েছে।

আপন সন্তান-সন্তুতি পিতা-মাতার মৃত্যুর পর একবারের জন্যও দেখার প্রয়োজন মনে করেনি। অর্থবিত্তের অভাব নেই, সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এমনকি মেয়ে ডাক্তার তারপরও কোন হাসপাতাল গ্রহণ করেনি। চিকিৎসার অভাবে রাস্তায় মরতে হয়েছে। স্বামী থেকে স্ত্রী কে, মাকে থেকে সন্তানকে, ভাই থেকে বোনকে, পুরো পরিবার কে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তি, ক্ষমতা, পেশিশক্তি কিছুই কাজে আসছে না। সমস্ত কিছুই অচল, অসাড় প্রমাণিত হয়েছে।

কারো কারো হৃদয়ে মানবিকতা জাগ্রত হয়েছে। সবাই যার যার সামর্থ্য অনুসারে আশেপাশের অসহায়দের সাহায্যার্থে এগিয়ে যাচ্ছেন। সরকার প্রণোদনা ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন। অর্থনীতীকে পুনরুদ্ধার করার জন্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করছেন। অনেক আইন শিথিল করছেন। কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল বিলম্ব পরিশোধের জরিমানা মওকুফ করছেন।

মুদ্রার এপিট আর ওপিঠের মতো কেউ কেউ আবার এই দুযোর্গকালীন সময়ের সুযোগ নিয়ে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করছেন। লুফে নিচ্ছেন নিজেদের ফায়দা। লুটে খাচ্ছেন অসহায়দের জন্য বরাদ্ধ হওয়া ত্রাণ। হাতিয়ে নিচ্ছেন অস্বচ্ছল ও অনাথ মানুষগুলোর মুখের খাবার। অন্যদিকে ফ্রন্টলাইনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ডাক্তার, নার্স, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, পুলিশ সদস্য, আনসার সদস্য সহ স্বেচ্ছাসেবীরা এই মহামারীতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি কেউ মৃত্যুবরণ করছেন। কি এক বিভীষিকাময় সময় অতিক্রম করছে পৃথিবী!

এই ক্রান্তিকালে  মিডিয়ার মাধ্যমে কেউ বস্তুবাদে বিশ্বাসের দিকে আহ্ববান করছেন আবার কেউ একত্ববাদের দিকে আহ্ববান করছেন। অন্যায় ছেড়ে দিয়ে ভালো হয়ে পৃথিবীতে চলার কথা বলছেন। কিন্তু আমরা করোনা মহামারীর সঙ্কটকালীন সময়ে কতটুকু শিক্ষা গ্রহণ ও পাপাচার বর্জন করতে পেরেছি? পেরেছি কি সেই রবকে খুশী করতে? যিনি সমস্ত ভূ-মন্ডলের মালিক। অসীম ক্ষমতার অধিকারী। সমস্ত বাদশার বাদশাহ।

যিনি ক্ষমতাধর বাদশাহ নমরুদকে ক্ষুদ্র মশা দ্বারা শায়েস্তা করেছিলেন। ফেরাউনকে নীলনদের পানিতে চুবিয়ে বুঝিয়ে ছিলেন। কাবা ঘর রক্ষার জন্যে ছোট্ট আবাবিল পাখি প্রেরণ করে ছিলেন। তিনিই আমাদের রব আল্লাহ সুবহান। তিনি আমাদের রিযিক দেন। তিনিই আমাদের প্রতিপালক। আমরা তাঁরই গোলাম।

বলো আজ রাজত্ব কার ?

লেখক: মো. ইসমাঈল হাসান তানজির।

7 comments