তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কি?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কি?

’তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বাক্যাটির সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। ২০২ সালে এসে এই বাক্যের সাথে কাউকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। বরং, মানুষের দৈনন্দন জীবন এখন তথ্য – প্রযুক্তির সাথেই কাটছে। আমাদের জীবনের চারপাশে রয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নানা ব্যবহার।

তবে প্রযুক্তি একদিনেই এতো ডেভেলপ হয়ে যায়নি। মানুষের চিন্তা, গবেষণা, কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগের বিনিময়েই আজকের এই আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি এতো ডেভেলপ। বিশ্বের বিভিন্ন মানুষ শতাব্দির পর শতাব্দি প্রযুক্তি উন্নায়নে কাজ করেছে। আজ আমরা জানবো, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আদ্যোপান্ত

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কি?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কে ইংরেজিতে Information and communications technology বলা হয়। সংক্ষেপে এটিকে ’আইসিটি (ICT) বলা হয়ে থাকে। যেটা আমাদের পাঠ্য বইয়ে বা শিক্ষকদের কাছ থেকে অনেক বার শুনেছি।

প্রকৃতপক্ষে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বলতে ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থাকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ,  টেলিযোগাযোগ, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার, স্যাটেলাইট, মিডলওয়্যার তথ্য সংরক্ষণ, অডিও-ভিডিও, মাইক্রোওয়েব সিস্টেম ইত্যাদি। এগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এমন কোন যোগাযোগব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী খুব সহজেই তথ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ, সঞ্চালন ও বিশ্লেষণ করতে পারেন।

বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে: আইসিটি শব্দটির ব্যবহার শুরু করে ৯৮০ সালের দিকে একাডেমিক গবেষকরা। কিন্তু শব্দটি জনপ্রিয়তা লাভ করে ৯৯৭ সাল থেকে। স্টিভেনসন ৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্য সরকারকে দেওয়া এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই শব্দটি উল্লেখ করেন, যা পরবর্তীতে ২০০০ সালে যুক্তরাজ্যের নতুন জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে আইসিটি শব্দটিকে সংযোজন করা হয়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উপাদান সমূহ

যদিওবা প্রযুক্তির মূল উপকরণ হিসেবে কম্পিউটারকেই ধরা হয়। তবে কম্পিউটার ছাড়াও আরো কিছু বিষয় আছে, যা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উপাদান এর মধ্যে রয়েছে। যেমনঃ

  • হার্ডওয়্যার
  • কম্পিউটার
  • সফটওয়্যার
  • ইন্টারনেট বা নেটওয়ার্ক
  • স্যাটেলাইট
  • টেলিফোন
  • ডিজিটাল তথ্য বা ডেটা
  • মাইক্রোওয়েব ইত্যাদি

আইসিটি খাতে বাজেট

বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে মোট খরচের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ইউ.এস ডলার, যেটা বাংলাদেশী টাকায় কনভার্ট করলে ২৯৭,৮৩৫,৬৫০,০০০,০০০ হয়। প্রতি বছর তা ৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রতি ৫ বছরে এই খরচের মূল্য দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।

আমাদের বাংলাদেশের ২০২-২০২২ অর্থবছরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের জন্য বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে হাজার ৭২ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৩০৬ কোটি টাকা বেশি।

বিশ্বব্যাপী আইসিটি গবেষকরা মনে করছেন দিন যত পার হবে আইসিটি বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের বাজেট লাগামহীন ভাবে বেড়েই চলবে। আমরাও স্বচোখে তাই দেখতে পাচ্ছি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুফল

  • প্রযুক্তি ব্যবহারে যে কোন তথ্য সহজেই সংরক্ষণ করা যায়।
  • পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে সহজেই তথ্য আদান-প্রদান বা যোগাযোগ করা যায়।
  • অল্প সময়ে বেশী তথ্য ধারণ বা স্থানান্তর করা যায়। ফলে সময়ের অপচয় কম হচ্ছে।
  • ঘরে বসেই পৃথিবীর অভ্যন্তরিন বা মহা-বিশ্বের যে কোন তথ্য সহজেই জানা যায়।
  • তথ্য-প্রযুক্তি উন্নতির ফলে নিজ ঘরে বসেই শপিং বা কেনাকাটা করা যায়।
  • প্রযুক্তির ব্যবহারে ইন্টারনেট ভিত্তিক অগণিত কর্ম সংস্থান তৈরি হয়েছে।
  • প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
  • প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মানুষের শারীরিক পরিশ্রম কমে এসেছে।
  • আধুনিক বিশ্ব বাস্তবায়নে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সব ক্ষেত্রেই তা সম্ভাবনা তৈরি করছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার

প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। আমাদের চারপাশজুড়ে রয়েছে প্রযুক্তির বিচিত্রময় গ্যাজেট। যা আমাদের দৈনন্দন জীবনকে আরো সমৃদ্ধশালী করতে সহায়তা করছে। তবে তথ্য প্রযুক্তির সুফল ও কুফল উভয়ই আমাদের মাঝে বিচরণ করছে।

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আমাদেরকে যেভাবে সমৃদ্ধ করছে ঠিক সেভাবেই প্রযুক্তির অপব্যবহার অনেক মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে গেছে। তবে প্রকৃতপক্ষে এটা কখনই প্রযুক্তির দায় নয়। কারণ, সৃষ্টজীবের মধ্যে মানুষ একটি বিবেকবান প্রাণী। ভালো-মন্দ সে বুঝতে পারে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির গুরুত্ব

তথ্য প্রযুক্তি আসার পর থেকে মানুষের জীবন-যাপন অনেক সহজ হয়েছে। আদিযুগের মানুষেরা কোন কিছু করতে হলে তা শারীরিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই নিজেদেরকেই করতে হতো। ফসল ফলানো থেকে শুরু করে যত কঠিন কাজ আছে, তাও মানুষকেই করতে হতো। এতে করে মানুষের জীবন-যাপন ছিল কষ্টে সজ্জিত এবং বিভিন্ন ভাবে বেদনাময়।

কিন্তু প্রযুক্তি আসার পর থেকে মানুষের শারীরিক পরিশ্রমের কাজ কমতে শুরু করে। বর্তমান বিশ্বে সব ধরণের কঠিন শারীরিক কাজগুলোকে রোবট বা বিশেষ কোন মেশিন দ্বারা সম্পাদন করা হয়। তাছাড়া, মানুষের চাহিদা ও রুচির ভিত্তিতে প্রযুক্তি ব্যবহারে বিচিত্রময় যন্ত্রপাতি তৈরি করা হয়েছে। যা মানুষের খরচ কমিয়ে কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে।

উদাহারণতঃ আদিযুগে মানুষ পাহাড় কেটে যাতায়াতের রাস্তা তৈরি করতো শারীরিক পরিশ্রমের মধ্যদিয়ে। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর-যুগ পার করে দিতো রাস্তা তৈরিতেই। কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর শারীরিক পরিশ্রমে পাহাড় কাটতে হয় না, পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করার মতো বিশেষ যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে। যেটার মাধ্যমে অল্প সময়েই শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই যে কোন পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা যায়।

মানুষের জীবন-যাপনে প্রযুক্তির অনেক গুরুত্ব রয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। শিক্ষা থেকে শুরু করে লেনলেন, বাণিজ্য, কর্ম সংস্থান প্রক্রিয়াও এখন প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। আশা করা যায়, দিন যতই পার হবে প্রযুক্তির ব্যবহার ততই বাড়তে থাকবে।

আমাদের কথাঃ

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। সকল ক্ষেত্রেই খরচ কমিয়ে কাজের গতি বৃদ্ধি করেছে। মানুষের শারীরিক পরিশ্রমকে অনেকাংশে কমিয়েছে। তাই প্রযুক্তিকে মানুষের জন্য খুবই কল্যাণকর মনে করি। তবে অবশ্যই প্রযুক্তির সঠিক এবং সুব্যবহার চাই।

আমাদের সমাজে অনেক মানুষ প্রযুক্তির অপব্যবহারে নিমজ্জিত থাকে। এটা আসলে কোন ভাবেই কাম্য নয়। প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্যই মানুষ তৈরি করেছে। সুতরাং, এই প্রযুক্তি দিয়েই মানুষের অকল্যাণ সাধন বা অনিষ্টকরণের চর্চা মানবতা বিরুধী জঘন্য অপরাধ।

Add comment